চিকুনগুনিয়া লক্ষণ প্রতিকার ও চিকিৎসা পরবর্তী করণীয়

 

চিকুনগুনিয়া ভাইরাস কী?

 

চিকুনগুনিয়া (Chikungunya) হচ্ছে মশাবাহিত ভাইরাসজনিত একটি রোগ। চিকুনগুনিয়া ভাইরাস টোগা ভাইরাস গোত্রের ভাইরাস। মশাবাহিত হওয়ার কারণে একে আরবো ভাইরাসও বলে। ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাস ও একই মশার মাধ্যমে ছড়ায় এবং প্রায় একই রকম রোগের লক্ষণ দেখা যায়।

চিকুনগুনিয়া লক্ষণ প্রতিকার ও চিকিৎসা পরবর্তী করণীয়

চিকুনগুনিয়া রোগের লক্ষণঃ রোগের লক্ষণ সমূহ

(১) হঠাৎ জ্বর আসা সঙ্গে প্রচণ্ড গিঁটে গিঁটে ব্যথা। অন্যান্য লক্ষণ সমুহের মধ্যে- (২) প্রচণ্ড মাথাব্যথা (৩) শরীরে ঠাণ্ডা অনুভূতি (Chill) (৪) বমি বমি ভাব অথবা বমি (৫) চামড়ায় লালচে দানা (Skin Rash) (৬) মাংসপেশিতে ব্যথা (Muscle Pain)

সাধারণত রোগটি এমনি এমনিই সেরে যায়, তবে কখনও কখনও গিঁটের ব্যথা কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছরের বেশি সময় থাকতে পারে।

বাহক: এডিস ইজিপ্টি ((Ades aegypti) এবং এডিস এলবোপিকটাস (Ades albopictus) মশার মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। মশাগুলোর শরীরের ও পায়ের সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ দেখে সহজেই চেনা যায়।

কারা ঝুঁকির মুখে: এ মশাগুলো সাধারণত পরিষ্কার বদ্ধ পানিতে জন্মায় এবং যাদের আশপাশে এ রকম মশা বৃদ্ধির জায়গা আছে, সে সব মানুষেরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

কীভাবে ছড়ায়: প্রাথমিকভাবে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত এডিস ইজিপ্টাই অথবা এডিস অ্যালবুপিক্টাস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এ ধরনের মশা সাধারণত দিনের বেলা (ভোর বেলা অথবা সন্ধ্যার সময়) কামড়ায়। এছাড়াও চিকুনগুনিয়া ভাইরাস আক্রান্ত রক্তদাতার রক্ত গ্রহণ করলে এবং ল্যাবরেটরীতে নমুনা পরীক্ষার সময়ে অসাবধানতায় এ রোগ ছড়াতে পারে।

সুপ্তিকাল: ৩-৭ দিন (তবে ২-২১ পর্যন্ত হতে পারে)।

প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ: এ রোগ প্রতিরোধের কোনো টিকা নাই। ব্যক্তিগত সচেতনতাই চিকুনগুনিয়া ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রধান উপায়।

মশার কামড় থেকে সুরক্ষা: মশার কামড় থেকে সুরক্ষাই চিকুনগুনিয়া থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায়। শরীরের বেশির ভাগ অংশ ঢাকা রাখা (ফুল হাতা শার্ট এবং ফুল প্যান্ট পরা), জানালায় নেট লাগানো, প্রয়োজন ছাড়া দরজা জানালা খোলা না রাখা, ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা, শরীরে মশা প্রতিরোধক ক্রিম ব্যবহার করার মাধ্যমে মশার কামড় থেকে বাঁচা যায়।

শিশু, অসুস্থ রোগী এবং বয়স্কদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

মশার জন্মস্থান ধ্বংস করা: আবাসস্থল ও এর আশপাশে মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। বাসার আশপাশে ফেলে রাখা মাটির পাত্র, কলসী, বালতি, ড্রাম, ডাবের খোলা ইত্যাদি যেসব জায়গায় পানি জমতে পারে, সেখানে এডিস মশা প্রজনন করতে পারে। এসব স্থানে যেন পানি জমতে না পারে সে ব্যাপারে লক্ষ রাখা এবং নিয়মিত বাড়ির আশপাশে পরিষ্কার করা। সরকারের মশা নিধন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা।

যেহেতু এ মশা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত থেকে জীবাণু নিয়ে অন্য মানুষকে আক্রান্ত করে, কাজেই আক্রান্ত ব্যক্তিকে যাতে মশা কামড়াতে না পারে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া।

রোগ নির্ণয়: উপরোল্লিখিত উপসর্গগুলো দেখা দিলে, ওই ব্যক্তির চিকুনগুনিয়া ভাইরাস সংক্রমণের আশংকা থাকে। উপসর্গগুলো শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে ভাইরাসটি (Serology Ges এবং RT-PCR) পরীক্ষার মাধ্যমে সনাক্ত করা যায়।

 

চিকুনগুনিয়া টেস্ট

 

বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিটিউট (আইইডিসিআর)-এ চিকুনগুনিয়া রোগ নির্ণয়ের সকল পরীক্ষা করা হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস নিশ্চিতভাবে সনাক্ত করার স্থান হল রাজধানীর মহাখালিতে অবস্থিত রোগ তত্ত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট আইইডিসিআর। এই গবেষণা কেন্দ্রে ‘সেলোরজি’ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে চিকুনগুনিয়ার ভাইরাস সনাক্ত করা সম্ভব।

ভাইরাসটি এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানো মশাটি সুস্থ কাউকে কামড়ালে তার শরীরেও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ ঘটে।

চিকুনগুনিয়া লক্ষণ

জ্বরের লক্ষণগুলো অন্যান্য সকল ভাইরাল জ্বরের মতোই। হাড়ের জোড়ায় তীব্র ব্যথাই এই রোগের একমাত্র স্বতন্ত্র উপসর্গ। সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখ জ্বালাপোড়া, বমিভাব, শারীরিক দুর্বলতা, সর্দি-কাশি, র‌্যাশ ইত্যাদি তো আছেই।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে জ্বর সেরে যায়। তবে হাড়ের জোড়ের ব্যথা নাছোড়বান্দায় রূপ নেয়। ব্যথার তীব্রতাও প্রচণ্ড। ফলে রোগীর স্বাভাবিক হাঁটাচলা, হাত দিয়ে কিছু ধরা এমনকি হাত মুঠ করতেও বেশ কষ্ট হয়। আর শরীর প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে

 

চিকুনগুনিয়া  চিকিৎসা

চিকুনগুনিয়া ভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক। এই রোগের বিশেষ কোনো ওষুধ বা টিকা নেই। একটানা তিন দিন জ্বর ও হাড়ের জোড়ে প্রচণ্ড ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে কোনো উপকার নেই। প্রচুর পরিমাণে পানি পান করার পাশাপাশি ডাবের পানি, স্যালাইন, লেবুর শরবত প্রভৃতি পান করতে হবে। পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে।

জ্বরের পরেও বিভিন্ন জোড় বা জয়েন্টে ব্যথা থাকলে, তাকে পোস্ট চিকুনগুনিয়া আর্থ্রাইটিসও বলা যায়। এই জ্বরের পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরে হাড়ের জোড়ে ব্যথা থাকে। এমনকি জোড় ফোলাও থাকতে পারে। ব্যথা কমাতে প্যারাসিটামল বা ট্রামাডল-জাতীয় ওষুধ খাওয়া যেতে পারে।
কারও কারও ক্ষেত্রে এ ব্যথা দীর্ঘায়িত হতে পারে। চিকুনগুনিয়া কিন্তু অপ্রকাশিত বাতরোগকে বিশেষ করে রিউমেটিক আর্থ্রাইটিসকে প্রকাশ করে দিতে পারে। তাই ব্যথা দীর্ঘায়িত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বয়স্কদের বা অন্য রোগে আক্রান্তের বেলায় ব্যথা জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এই জ্বরপরবর্তী সময়ে বিশ্রামে থাকার চেষ্টা করতে হবে। ভারী বা বেশি পরিশ্রম হয় এমন কাজ যাবে না। না হলে ব্যথা বাড়তে পারে। তবে হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে এবং ফিজিওথেরাপি নেওয়া যেতে পারে। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় বসে থাকা ঠিক নয়। ঠান্ডা সেঁক দিলে ব্যথা অনেকাংশে কমে যায় বা আরাম পাওয়া যায়।

প্রচুর তরলজাতীয় খাবার খেতে হবে। পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। অনেক সময় শরীরে লবণের পরিমাণ কমে গিয়ে, রক্তচাপ কমে গিয়ে মাথা ঘোরাতে পারে। তাই রক্তচাপ মেপে যদি কম থাকে, তাহলে মুখে খাবার স্যালাইন খেতে হবে। এই সময়ে শাকসবজি, বিভিন্ন ফলমূল বেশি করে খাওয়া যেতে পারে। তিন সপ্তাহ পরও যদি দুর্বলতা না কমে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
চিকুনগুনিয়ার পর অনেকের বিশেষ করে হাত-পায়ে জ্বালাপোড়া, ঝিনঝিন বা কামড়ানোর মতো ব্যথা হতে পারে। আবার কেউ বিষণ্নতায় ভুগতে পারে। প্রচণ্ড ব্যথা, কাজে ফিরতে না পারা, দৈনন্দিন কাজগুলোও ঠিকভাবে করতে না পারা এই ঝুঁকি বাড়ায়। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

চিকুনগুনিয়া প্রতিকার

সচেতনতাই চিকুনগুনিয়া ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রধান উপায়। কেননা, এ রোগ প্রতিরোধের কোনো টিকা নাই।   মশার কামড় থেকে সুরক্ষাই চিকুনগুনিয়া থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায়। শরীরের বেশির ভাগ অংশ ঢাকা রাখা (ফুল হাতা শার্ট এবং ফুল প্যান্ট পরা), জানালায় নেট লাগানো, প্রয়োজন ছাড়া দরজা-জানালা খোলা না রাখা, ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা, শরীরে মশা প্রতিরোধক ক্রিম ব্যবহার করার মাধ্যমে মশার কামড় থেকে বাঁচা যায়। শিশু, অসুস্থ রোগী এবং বয়স্কদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
মশার আবাসস্থল ও এর আশপাশে মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। বাসার আশপাশে ফেলে রাখা মাটির পাত্র, কলসি, বালতি, ড্রাম, ডাবের খোলা ইত্যাদি যেসব জায়গায় পানি জমতে পারে, সেখানে এডিস মশা প্রজনন করতে পারে। এসব স্থানে যেন পানি জমতে না পারে, সে ব্যাপারে লক্ষ রাখতে হবে। বাড়ির আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
যেহেতু আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত থেকে জীবাণু নিয়ে মশা অন্য মানুষকে আক্রান্ত করে, কাজেই আক্রান্ত ব্যক্তিকে যাতে মশা কামড়াতে না পারে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে।

Comments

comments

Join the discussion

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।